বুধবার, ১৩ জুলাই, ২০১১

শঙ্খনীল ভালবাসা

বৃষ্টি ভেজা এক সকালে তমাল ব্যাথিতো মনে দরজার পাশে বসে আছে।আজ মৌমিতার আসার কথা।কিন্তু বৃষ্টির হাব-ভাব দেখে মনে হয়না যে খুব শীঘ্রই থামবে।তাই হয়তো মৌমিতারও আসা হবে না।মন খারাপ করে চুপটি মেরে বসে রইল তমাল।দূরে নারিকেল গাছের পাতা বেয়ে বৃষ্টির পানি পরার দৃশ্য দেখতে লাগলো।মনের মধ্যে কিছু অযাচিত প্রশ্ন উঁকি দিয়ে যাচ্ছে....

মৌমিতা!!!বৃষ্টি ভেজা স্নিগ্ধ এক বর্ষার সন্ধ্যায়,গোলাপি সিল্কের শাড়ি পড়ে,রাস্তার পাশে দাড়িয়ে থাকা অবস্থায় মৌমিতাকে প্রথম দেখতে পায় তমাল।পুরো শরীর বৃষ্টির পানিতে ভেজা।কপালে গোলাপি রঙের বড় একটি টীপ।বড় বড় দুইটি চোখ।বা-চোখের কোণে একটি জলবিন্দু চিকচিক করছে।কি অপূর্বই না লাগছে দেখতে।তমাল যেন ঐ জলবিন্দুর প্রেমে পড়ে গেলো!!!

তমাল মৌমিতার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।"বৃষ্টির পানি গায়ে লেগে থাকলে যে ঠাণ্ডা লেগে যাবে"এই বলে গাড়ি থেকে তোয়ালে এনে মৌমিতার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,চলুন আপনাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসি।

তমাল,মৌমিতা আর তার ছোট ভাইকে নিয়ে গাড়িতে।তমাল ড্রাইভিং করছে আর ওরা দুইজন পেছনের সিটে বসা।ওয়াচিং গ্লাস দিয়ে তমাল মৌমিতাকে দেখছে।বিধাতা তাঁর নিপুণ হাতে নিখুঁত করে বানিয়েছেন মৌমিতাকে।অবাক দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে মৌমিতা ! কি যেন দেখে হঠাৎ হেসে ফেললো।অসম্ভব রকম সুন্দর তার হাসি!!!তমাল অপলক দৃষ্টিতে তা দেখতে লাগলো।আর ভাবনার জগতে হারিয়ে গেলো।তার ভাবনায় ভারতচন্দ্রের সেই কবিতাটা চলে আসলো-

"কে বলে শারদশশী,সে মুখের তুলা
পদ নখে পড়ে আছে,তার কতগুলা।"

ভাবনার রেশ কেটে গেলো মৌমিতার কন্ঠ আকস্মিক কানে আসাতে-EXCUSE ME,আমাদের বাসা এসে পড়েছে,KINDLY নামিয়ে দিন।গাড়ি থেকে নেমে তমালকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেলো মৌমিতা,রেখে গেলো কিছু অনুভূতি।তমালের বুকের বাঁ-পাশটা একটু ব্যাথা করতে লাগলো।


মৌমিতার সাথে পরিচয় আজ প্রায় দুই বছর।ঐ দিনের মতো আজও প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে।বৃষ্টি হচ্ছে তমালের মনোকুঠিরের দেয়াল বেয়ে।আর উপচিয়ে পড়ছে কিছু নাম না জানা রং।মৌমিতাকে ভালোলাগার ব্যাপারটা অনেক আগেই ভালবাসাতে পরিণত হয়েছে।বারবার চেষ্টা করেও সে কথাগুলো মৌমিতাকে বলতে পারেনি।হয়তো কখনো পারবেও না!!!

তমালের হঠাৎ চোখ পড়লো দূর থেকে ভেসে আসা গোলাপি কিছু একটার দিকে।প্রবল বৃষ্টির কারনে বোঝা যাচ্ছে না।তবে তমালের কাছে আর অবোধ্য রইলো না যে,গোলাপি শাড়ি পড়ে মৌমিতা তাদের বাসায় আসছে।এতো বৃষ্টির মধ্যেও মৌমিতা তার সাথে দেখা করতে আসবে,তা তার জানা ছিল না।কাছে আসতেই সে দেখতে পেলো,গোলাপি রঙের শাড়ি আর বড় গোলাপি একটি টীপ পরিহিত অবস্থায় মৌমিতা।আজও তার বা-চোখের কোণে একটি জলবিন্দু চিকচিক করছে।আজও আবার এই জলবিন্দুর প্রেমে পড়তে ইচ্ছা করছে তমালের !!!

তমালকে দরজার পাশে বসে থাকতে দেখে মৌমিতা হাসিমাখা কন্ঠে বলতে লাগলো,তোমার সাথে আমার পরিচয়ের আজ দুই বছর পূর্ণ হল।তাইতো সেইদিনের মতো করে সেজে এসেছিলাম।কিন্তু দেখলে আজও বৃষ্টিটা আমাকে ভিজিয়ে দিলো।তোয়ালে নিয়ে আসো তো,গা মুছে ঘরে ঢুকব।

তমাল নিথর হয়ে বসে রইল।তার চোখের কোণে জলবিন্দু চিকচিক করছে।কিন্তু এইটা যে বৃষ্টির জলবিন্দু নয়!!!!

বৃহস্পতিবার, ৭ জুলাই, ২০১১

অন্তিম বিসর্জন

সব দিয়েও
    না পাহিবো তাহারে,
        ক্রন্দনরত মন-
           কি অন্তিম বিসর্জন!!!

হঠাৎ আসা এই প্লাবনে
    বৃষ্টিস্নান্ত এই লগনে,
        উঁকি দিয়ে সে যায়
            মনের অন্তরায়।

আচমকা এক ঝড়ের বেলায়
    তাহার-আমার মিলন মেলায়,
         অবুঝ মনের গহীন বনে-
শিহরন দিয়ে যায়।
     স্বর্গীয় অপ্সরীর ন্যায়
           সে নিজেকে লুকায়।

ক্ষণিক ক্ষণের ঐ লগন
     সৃতির ভেলায় চড়ে
          উঁকি দিয়ে যায়,
মৃদু যন্ত্রণা-
     বুকের মাঝে
          কাতরাইয়ে মারে হায়।

বুধবার, ৬ জুলাই, ২০১১

চূর্ণ অস্থি

বুকের ভেতর চূর্ণ অস্থি
মাঝখানটায় ঘাঁ,
অনেক যতনে বেঁড়ে উঠছে সেখানে
রক্তের ফোঁয়ারা।

হৃদয় ভাঙ্গা সখার মত হঠাৎ 
সিউঁরে ওঠে গাঁ,
বুক ফাটা আর্তনাদে
অবলিলায় কেঁদে উঠা।

বুকের ভেতর চূর্ণ অস্থি
তার মাঝখানটায় ঘাঁ।

অজানা এক বাঁধন

অন্ধকার ঘরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তমাল।অঝোর বৃষ্টির ফোটা বাতাসের নাওয়ে ভেসে তমালের শরীরটা ভিজিয়ে দিচ্ছে।কিন্ত সে এতটুকুও নড়ছে না।মনভরে প্রকৃতির এই নিদারুণ খেলা দেখতে লাগলো।আর একটি হাত জানালার বাইরে মেলে ধরে অতীতের স্মৃতিগুলোকে তাড়া করতে লাগলো।

নীলিমা!!!নীলিমারা এই শহর ছেঁড়ে চলে গেছে প্রায় দেড় বছর।তবু আজও তার অশ্রুমাখা চেহারাটা ভেসে উঠে চোখের সামনে।কতই না অতৃপ্ত স্বপ্ন অংকুরেই ঝরে গেলো হঠাৎ আসা প্লাবনে।

তমালের স্বপ্নগুলো কেমন যেন ছন্নছাড়া।তার নির্ঘুম রাতের সঙ্গী অসীম রহস্যের রাতের আকাশ।কখনো মেঘলা আবার কখনো ভরা পূর্ণিমা।সব কিছুই যে তার খুব পরিচিত।আকাশের দিকে তাকিয়ে সে যেন কাকে খুঁজে বেড়ায়।

ঐ দিন শুক্রবার।পাশের ফ্ল্যাটের রফিক আঙ্কেল আকস্মিকভাবে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নেন।রেখে যান ১৭ বছরের মেয়ে নীলিমা আর ৪ বছরের ছেলে শুভ কে।নিষ্পাপ দুইটি মুখ।

আঙ্কেল মারা গেছেন প্রায় দুই বছর।আজও তমাল ঐ দিনের কথা ভুলতে পারে না।মনে পড়লেই বুকের ভেতর কেমন যেন অজানা ব্যাথা শুরু হয়।ভয়াবহ ব্যাথা।এর কারনটা তমাল এখনও খুঁজে বের করতে পারে নি।

তমাল সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে।কান্নার শব্দ ভেসে আসছে ঘরের ভিতর থেকে।ঘরে অনেক লোকের সমাগম।ঢুকতেই আন্টিকে চোখে পড়লো।আন্টি আঙ্কেলের মৃত শরীরটাকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো আর্তনাদ করছে।কিছু আত্মীয় উনাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করছে।কিন্ত কোন লাভ হচ্ছে না।হঠাৎ করে শুভকে চোখে পড়ল।বাবা মারা যাওয়ার ব্যাপারটা তার কাছে বোধগম্য নয়।তাই সে এত লোকের মাঝেও তার খেলনার গাড়ি নিয়ে খেলছে।শুভর দিকে তাকিয়ে আন্টি আরো শব্দ করে কাঁদতে শুরু করলো।কেমন যেন শোকের ছায়া চারদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে।

কি ব্যাপার নীলিমাকে দেখা যাচ্ছে না কেনো?আরে ঐতো মেধাবী ছাত্রী নীলিমা।অপরূপ সুন্দরী।কলেজের এর 1st গার্ল।কত গর্বই না বাবার তাকে নিয়ে।দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে এক কোণায়,চোখের অবিরাম অশ্রুধারা গাল বেয়ে পরছে।কিন্ত মুখে একটি শব্দও নেই।নীলিমা বিড়বিড় করে কি যেনো বলছে।হয়তো বলছে "বাবা,আমার যে আর মাত্র ৬ দিন পর HSC এর রেজাল্ট দিবে,তুমি কি জানো না?জানলে কেন তোমার মেয়ের রেজাল্ট না দেখে চলে গেলে?"

হঠাৎ খুব শব্দ করে কাঁদতে শুরু করলো নীলিমা।বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে কাঁদতে লাগলো।চোখ বেয়ে অবিরাম বর্ষণ হচ্ছে।কি নিষ্পাপ একটি মেয়ে কাঁদছে।তমালের ইচ্ছা করছে নীলিমাকে জড়িরে ধরে ওর কান্না থামানো।কিন্তু কখনো কখনো সব ইচ্ছা পূরণ হয় না।নীলিমার অশ্রুশ্রান্ত চোখের দিকে তাকাতেই তমালের মনে কিঞ্চিৎ ব্যাথা অনুভূত হলো।সেই ব্যাথাই আজ অনেক বড় আকার ধারন করেছে।

তমাল তার অন্য হাতটাও জানালার বাইরে মেলে ধরে বৃষ্টির আকাশ আর বৃষ্টির খেলা দেখতে লাগলো।হয়তো সে নীলিমার সাথে অজানা এক বাঁধনে বাঁধা পড়ে গেছে । 

মঙ্গলবার, ২৮ জুন, ২০১১

আকস্মিক স্তব্ধতা

"রনি ওই রনি,উঠছ না,ক্লাস শুরু হওয়ার সময় হয়ে গেছে,উঠ যলদি,কিরে উঠছ না কেন?আমি গেলাম ক্লাস করতে"- ১১ বছরের দেব তার বোর্ডিংস্কুলের রুমম্যাট রনিকে ডেকে নিরাশভাবে ক্লাসে চলে গেল।

রনি এখানে এসেছে প্রায় ছয় মাস।খুবই চঞ্চল প্রকৃতির ছেলে রনি।আর এই চঞ্চলতার কারনেই তাকে বোর্ডিংস্কুলে পাঠানো হয়েছে।বাসায় থাকাকালীন সময়ে বড় ভাইটাকে জ্বালিয়ে মারতো।সারাদিন মাথায় শুধু দুষ্টামির চিন্তা।একদিন করল কি,বড় ভাইটার স্কুলের প্যান্ট কেটে নিজের জন্য হাফপ্যান্ট বানিয়ে ফেলছিল। স্কুলে যাবার সময় হলে ভাই তার কান্ডকারখানা টের পায়।ওই দিন রনিকে তার ভাইটার কাছ থেকে অনেক মার খেতে হয়েছিল।তবে সে জানে যে যতই মারুক আর বকুক না কেন,তার ভাইটা তাকে অনেক ভালোবাসে।তাইতো প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় তার সব চেয়ে প্রিয় কিটকেট চকলেট নিয়ে আসতো তার জন্য।তার ক্রিকেট খেলা,সাইকেল চালানোর হাতেখড়িও হয় বড় ভাইটার কাছ থেকেই।

এখানে আসার পর তার মধ্যে তুমুল পরিবর্তন দেখা গেল।হঠাৎ করেই যেন ছেলেটা কেমন মনমরা হয়ে পড়লো।চোখের নিচে কালো দাগ পরে গেলো।কেমন যেন রোগা রোগা হয়ে গেলো।আর সব চেয়ে বড় পরিবর্তনটা হল,কখনো বড় ভাইটা তাকে দেখতে আসলে,তার সাথে আর দুষ্টামি করে না,বরং ভাইটাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে,একটা কথাও মুখ ফুটে বলে না।মনে মনে বিড়বিড় করে বলতে থাকে "ভাই,তোকে আমি অনেক ভালোবাসি রে" তার ভাইটাও কি একই কথা বলতো কিনা কে জানে!!!

আজ বৃহস্প্রতিবার।গ্রীষ্মের ছুটির আগে আজই শেষ ক্লাস।বোর্ডিংস্কুলের সকল ছাত্রের মধ্যে কত উত্তেজনা কাজ করতেছে,ক্লাস শেষে বাড়ি যাবে।কিন্ত এ কি!!! রনি তো দেখি এখনো ঘুমিয়ে আছে।ক্লাস শেষে দেব রোমে এসে বলতেছে"এই রনি উঠ না,আঙ্কেল-আন্টি এখনই চলে আসবে।উঠ বলতেছি।" কিন্ত রনির কোনো সারা-শব্দ নেই।

 দেবের কাছে রনিকে আগে অনেক রহস্যময় লাগত।রনি প্রায়ই রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতো আর কি যেন বিড়বিড় করে বলতো।দেব বোঝতো না,ঠাট্টা করে বলতো "কিরে রনি,তুই কি পাগল হয়ে গেছিস নাকি??"রনির কাছ থেকে কোনো উত্তর আসতো না।সে সব সময় কেমন যেন অন্যমনস্ক থাকতো।একদিন গভীর রাতে দেবের ঘুম ভেঙ্গে গেলে,অন্ধকার ঘরের মধ্যেই সে দেখতে পেল,রনি যেন কার ছবির দিকে তাকিয়ে কাঁদতেছে,দেবের কাছে আর অবোধ্য রইল না যে,ছবিটা তার বড় ভাইয়ের।রনির চোখের নিচের কালোদাগ গুলোর কারনও তার কাছে আর অস্পষ্ট রইলো না।

"রনি,আমার জাদুমণি উঠ না,উঠ সোনা,উঠ,দেখ তোর মা এসেছে তোকে নিয়ে যেতে।উঠ বাবা,বাসায় যে তোর ভাইটা তোকে এক সারপ্রাইস দিবে বলে অপেক্ষা করতেছে,উঠ না লক্ষী ছেলে আমার,উঠ।"মার কান্না জরানো কথাগুলো যে তার আদরের ছেলের কানে যাচ্ছে না।প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে বাইরে থেকে আম্বুলেঞ্চ এর শব্দ আসতেছে।

শনিবার, ২৫ জুন, ২০১১

একটি ইলিশ মাছ

বাজারে ইলিশের যে দাম তাতে করে মধ্যবিত্তদেরই কিনতে হিমসিম খেতে হয়,আর গরিব হলেতো কথায় নাই। কিন্ত এই কথা পরিবানুকে কে বোঝাবে? সে তো নাছোড়বান্দা। তাকে যে ইলিশ খেতেই হবে।একদিন কোন এক পাড়ার মেয়ের কাছে শুনেছে যে ইলিশ খেতে নাকি দারুন মজা।তাই সে ওই দিন থেকেই আবদার করে বসে আছে যে তাকে ইলিশ মাছ খাওাতেই হবে।তার কাছে তো আর এইটা বোধগম্য না যে তার বাবা একজন রিকশাচালক।সারা দিন রিকশা চালিয়ে তিন ছেলে,এক মেয়ে আর নিজের আর বউ এর দুবেলার দুমুঠো খাবার যোগার করতেই তার জন্য সমস্যা হয়ে যায়।তারপরও সে একমাত্র মেয়ের আবদারের কথা মাথায় রেখে একদিন বাজারে যায়, কিন্ত ইলিশের দাম শুনে তার আর মাছটা ধরে দেখারও সাহস হয় না।সে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরতেছে।সে জানে আজও প্রতিদিনের মতো তার ৮ বছরের মেয়ে তার আশায় বসে আছে এই ভেবে হয়তো আজ বাবা সত্যি ইলিশ মাছ নিয়ে আসবে আর সে খুব খুশি মনে তা নিয়ে মাকে দিয়ে বলবে মা ইলিশ মাছ ভাজ তো।গরম গরম ভাতের সাথে খাবো।তার মেয়ের এই রকম ছেলেমানুষির কথা ভাবতে ভাবতে তার চোখে জল চলে আসে,হয়ত কোনোদিনও সে তার পরম আদরের মেয়ের ওই হাসিমাখা চেহারায় খেতে দেখবে না,সবই যে তার ব্যর্থতা।সে কি করে তার অবোঝ মেয়েটাকে বোঝাবে যে তার বাবা,তার মুখে হাসি ফোটাতে সক্ষম নয়।সে বাসায় ফিরতেই পরিবানু প্রতিদিনের মতো ছুটে এসে বাবাকে জরিয়ে ধরে বলে বাবা ইলিশ আনছো? স্বামীর কষ্টটা বোঝতে পেরে  পরিবানুর মা  পরিবানুকে কাছে ডেকে নিয়ে বলতেছে,চুপ কর,দেখশ না,সারা দিন কাম কইরা তর বাবা এহন মাত্র বাসায় ফিরল,কেন জ্বালাতন করতেছিস? মার কাছে বকা খেয়ে চোখ মুছতে মুছতে দৌড়ে ঘরে ধুকে গেলো। বাবা মা দুজনেই বোঝতে পারল যে,তাদের মেয়ে আজ কাঁদতে শিখেছে।তারাও কেদে ফেললো।একটু পর ঘরের ভিতর থেকে আওয়াজ আসতে লাগলো যে,আমি আজ খাবো না।যাও তো এখান থেকে।ঘরের পীড়ায় বসে কথাগুলো শুনতে শুনতে আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে লাগলো পরিবানুর বাপ.........
আজ প্রায় ছয় মাস হতে চলছে।পরিবানু ঠিক বোঝতে পেরেছে যে তার বাবা তাকে কোনদিনও ইলিশ মাছ খাওয়াতে পারবে না।তাই এখন আর মিছে আবদার করে না পরিবানু। আজ অনেক রাত হয়ে এলো,বাবা এখনো বাসায় ফিরছে না।মা মিছে মিছে চুলায় হাড়ি বসিয়ে রেখেছে।ছোট ভাইটা বারবার খাবারের জন্য তাগাদা দিতেছে,মা বলতেছে এইতো ভাত রান্না হয়ে আসতেছে।একটু পর আলু ভর্তা করেয় খেতে দিবো।কিন্ত হাড়ি তে যে কিছই নেয়।কোত্থেকে চাল আর আলু আসবে?বাবা যে এখনো বাড়ি ফিরে নাই।ছোট ভাইটা খাওয়ার আশায় আশায় না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে।মা হয়তো ভুলে গেছে যে তার আদরের পরিবানু বোঝতে শিখেছে...........এই যে বাবার পায়ের আওয়াজ আসতেছে।বাবা হয়তো এসে পড়েছে। ছোট ভাইটাকে যে ঘুম থেকে উঠিয়ে খাওয়াতে হবে।তাই পরিবানু ছুটে গিয়ে বাবার কাছ থেকে বাজারের ব্যাগ আনতে গেল।কি ব্যাপার?ব্যাগটা এতো ভারি লাগতেছে কেন? মাছের গন্ধ ও আসতেছে।সে বাবাকে বললো বাবা কি মাছ এইটা? বাবা কোন উত্তর না দেয়ায়,ছুটে মাকে গিয়ে বললো দেখো মা,বাবা যেন কি মাছ নিয়া আইসে,অনেক সুন্দর গেরান।মা বললো আরে বোকা মেয়ে এইটাই যে ইলিশ মাছ,এই কথা শুনার পর পরিবানুর চোখে পানি চলে আসল,সে খুব ভাল করে মাছটাকে ধরে দেখল।মাছ কাটা থেকে শুরু করে মাছ ভাঁজা পর্যন্ত খুব আগ্রহ নিয়ে মার সাথে আঠার মতো লেগে ছিল।তা দেখে পরিবানুর বাবার চোখে সুখের জল এসে পরল। পরিবানু ছোট ভাইটাকে ডেকে আনতে গেল,বললো দেখ বাবায় ইলিশ আনছে।খাইতে আস।সবাই এক সাথে খেতে বসলো।মা গরম ভাত রানছে ,ভাত থেতে গরম গরম ভাব উঠতেছে।ইলিশ মাছ আর শুকনা মরিচ ভাজা দিয়ে পরিবানু খুব মজা করে খাইতেছে আর বলতেছে মা অনেক ভাল হইছে।আর পরিবানুর বাবা বলতে লাগলো বউ তুমিতো অনেক ভাল রাঁধো।স্বামীর মুখে এই প্রথম তার রান্নার প্রশংসা শুনে কেঁদে ফেললো পরিবানুর মা,এটা যে খুশির কান্না.............................................

শনিবার, ১৮ জুন, ২০১১

জোছনাস্নাত বরষা.............(আবির + ক্ষণিকের আগুন্তক)

   
                                                

রিম ঝিম বৃষ্টি
আচমকা দখিনা হাওয়ায়
এলোমেলো আমি।
চেনা জলকণার অচেনা পরশে,
অশান্ত বরষে,
নিশ্চুপ একা থামি।।

অসীম ভেসে চলা মেঘ,
চাঁদ ডুবে যায়,
অশান্ত এ মন।
নির্বাক জলের ফাঁকে,
স্মৃতিরা ভেলা হয়ে
আনকা পবন।।

তবুও থামি না আমি-
হেঁটে যাই বহুদূর;
স্মৃতির ভেলায় চরে, বিলাসী আমি
গেয়ে যাই-
চিরচেনা সেই সুর।।

ধু ধু বালুচর সুরের মায়ায়-
কাশফুলময়,
শরতের আগেই বর্ষাস্নাত।
অশ্রুবিন্দু বৃষ্টি ধারায়,
মিশে একাকার, হৃদয় ঘুড়ি
ক্রন্দনরত অব্যাহত।।

রাত বয়ে যায়, বৃষ্টি থামে
মেঘের ফাঁকে,
আলতো হাসে জোছনার ফুল।
চোখের তারায় ঘুম নামে না
সুর থামে না,
ইচ্ছেগুলো দখিন হাওয়ায় ছিন্নমূল।।

রাত্রি শেষে, নির্জন কোনে
নতুন স্বপ্নের দৃশ্য বুনে,
আবার জ্বালি আলো;
হয়তো কোন দিনের শেষে,
সেই আলোটাই,
সরিয়ে দিবে কালো।।

সেই আশায় আজ বুক বাঁধা
সকাল হলেই, দুয়ার পানে
ফেলফেলিয়ে তাকিয়ে থাকা,
পথও মাঝে তোমায় খোঁজা-
আসবে হয়ত আমার পানে
ভাসিয়ে দেবে নতুন গানে....