বৃহস্পতিবার, ২৫ আগস্ট, ২০১১

রংধনু

ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে হেটে চলছে নিলয়। গায়ে বৃষ্টির ফোটা তেমনভাবে লাগছে না, তবুও কেন যেন তার অভাবনীয় ভালো লাগছে।পূব আকাশে রংধনু উঠেছে। রংধুনুর সাত রঙা আলোতে নিজেকে তার খুব রাঙিয়ে তুলতে ইচ্ছে করছে।

আজ যদি বসন্তের হাওয়া এসে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেত, রাঙিয়ে দিতো বসন্তের সাত রঙা রঙে!!! কথা হতো বসন্তদূতের সাথে!!! বসন্তের সকল আভাস মনের মধ্যে গেথে রাখতে পারত!!!

ঘুম থেকে উঠেই নিলয় বাসা থেকে বের হয়। ভার্সিটি বন্ধ। এক বন্ধুর বাসায় যাবে। আকাশটা খুব মেঘলা। মা এতো করে ছাতা নিয়ে আসতে বললেও নিজের অভিরুচির মান রক্ষার্থে আর নিয়ে আসা হয় নি। বন্ধুরা দেখলে হাসাহাসি করবে। আর বন্ধুদের সামনে তার যে ইমেজটা আছে তা সে কিছুতেই হারাতে চায় না।তাই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ছাতাটা আনা হল না।

রাস্তায় মানুষজন কিছুটা কম। পায়ে হেটেই বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে দাড়ালো নিলয়। বাসের ছাউনিতে তিল পরিমান জায়গাও নেই দাড়াবার। তাই বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে দাড়াতে হলো। বাসের উপর খুব রাগ লাগছে তার। প্রায় ২০ মিনিট ধরে দাড়ানো, এখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টিও হচ্ছে। কখন যে ঝুম বৃষ্টি আরম্ভ হয়,তার ঠিক নেই। আর ছাউনিতে তো দাড়াবার মতো তিল পরিমান জায়গাও নেই। ঝুম বৃষ্টি নামলে তাকে আজ বৃষ্টিতে ভিজতেই হবে। বৃষ্টির প্রতি নিলয়ের কখনোই বিদ্বেষ ছিল না,এখনো নেই,কখনো হবে বলে মনেও হয় না। কিন্তু আজ বৃষ্টির উপর প্রচন্ড রাগ লাগছে যদিও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু ঝুম বৃষ্টি নামলে হয়তো আজ আর বন্ধুর বাসায় যাওয়া হবে না। আর এই জন্যেই রাগের মাত্রাটা একটু বেশিই লাগছে। নিজের উপর তার রাগও লাগছে। এতো করে মা বলল ছাতা নিয়ে আসতে কিন্তু সে বন্ধুদের মাঝে নিজের ইমেজ ঠিক রাখতে ছাতাটা নিয়ে আসলো না। নিজের উপর রাগটা আরও প্রকাণ্ড হল।

গোলাপি জামায় একটা মেয়ের দিকে চোখ পড়লো তার। ঠিক তার দুই হাত দূরত্বে দাঁড়ানো। কতক্ষন যাবত দাঁড়ানো তা ঠিক অনুমান করতে পারছে না নিলয়। নিজের উপর এতটাই বিরক্ত যে অন্যের দিকে তাকানো জরুরী হয়ে উঠে নি। তবে হঠাৎ চোখে পড়ায় কিচ্ছুক্ষনের জন্য থমকে যায় নিলয়। বিধাতা মানুষকে এতো সুন্দর করে কিভাবে বানায়,সেই রহস্য তার মাঝে খেলা করতে লাগলো। গোলাপি ঠোট,অনড় দুটি চোখ,অপলক দৃষ্টি,ছিপছিপে শরীরের গঠন,যে কোন ছেলেকেই তার প্রতি আকৃষ্ট করাতে সক্ষম। মেয়েটি তার সাথেই একই ভার্সিটিতে পড়ে। কোন বিভাগে তা জানা নেই নিলয়ের। নাম ঠিকানাও জানা নেই।

একটিবার মেয়েটি নিলয়ের দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়। নিলয় যেন কিছু সময়ের জন্য বৈদ্যুতিক শক খেলো। তার দৃষ্টি অনড়। ছাউনিতে দাঁড়ানো অনেকেই হয়তো তার এই চাহনিকে অভদ্রতা বলে আখ্যায়িত করছে,কিন্তু তার কোন পরোয়া নেই। বন্ধুদের কাছে নিজের ইমেজ ঠিক রাখতে যে ছেলে কিনা ছাতাই নিয়ে আসে না সেই ছেলে রাস্তায় দাড়িয়ে এই ভাবে অপলক দৃষ্টিতে কোন মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে,তা ভাবতেই অদ্ভুত লাগে।

তার চাহনিতে ব্যাঘাত ঘটালো আচমকা আসা ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টির মাত্রা এতোটাই বেশি ছিল যে,সাথে সাথেই নিলয়ের পুরো শরীর ভিজে যায়। নিলয় মেয়েটির দিকে আড়চোখে তাকায়, মেয়েটির হাতে গোলাপি ছাতা। মেয়েটি তাকে দেখে মুচিকি হাসি হাসে। এই হাসির রহস্য নিলয়ের অজানা। তারপরও তার কাছে অসম্ভব রকম ভালো লাগে সেই হাসি। নিলয়ের ভিজে যাওয়া দেখে মেয়েটার হয়তো কিছুটা করুনাই হল। এক কদম পা বাড়িয়ে দিয়ে নিলয়ের কাছে এসে দাড়ায়। বলে উঠে,আপনি চাইলে ছাতার নিছে আসতে পারেন। কিন্তু একটাই কন্ডিশন,ছাটাটা আপনাকে ধরতে হবে।

নিলয়ের হঠাৎ  করেই কেন যেন খুব ভালো লাগলো। বন্ধুরা তাকে বলে তুই তো চরম স্মার্ট,যে কোন মেয়েই তোরে প্রথম দেখেই ক্রাশ খাবে। কিন্তু কথাগুলো তার মোটেও বিশ্বাস হতো না। আর হবেই বা কেন,এতো দিনে তো কোন মেয়ে তার দিকে ভালো মতো তাকাতোও না। তবে আজ কেন যেন বন্ধুদের কথা তার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে।



ছাতা হাতে দাড়িয়ে আছে নিলয়,তার কিঞ্চিৎ পাশেই দাঁড়ানো এক অপরুপ রমণী। ভাবতেই নিলয় অবাক হচ্ছে। যে ছেলে কিনা ভয়ে কখনো মেয়েদের দিকে চোখ তুলে তাকাতো না,আজ তার এই অবস্থা দেখে সে নিজেই নিজের হাতে চিমটি কেটে দেখলো,এইটা বাস্তব নাকি সপ্ন। কেন যেন তার পুরোটাই সপ্ন মনে হচ্ছে। এক ঘোরের মধ্যে আছে সে। নিলয়ের মুখে আহ,আওয়াজ শুনে মেয়টি জিজ্ঞেস করলো-কি ব্যাপার। আমতা আমতা করে নিলয় বলল,না মানে দেখছিলাম চেক করে আমি সপ্ন দেখছি কিনা। কিন্তু চিমটিটা একটু বেশি জুরে হয়ে গেছে। মেয়েটি তার কথার রেশ কাটতে না কাটতেই সে কি হাসি শুরু করে দিল। প্রথমে নিলয় কিছুটা লজ্জিত হলেও একটু পর অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলো স্বর্গ থেকে নেমে আসা অপ্সরীর মুখের অবাক করা মিষ্টি হাসি


বৃষ্টি কমে যাচ্ছে,ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে,বাসের দেখা এখনো মেলে নি। মেয়েটির নাম পর্যন্ত জানা হলো না। হয়তো এখনই বলবে বৃষ্টি কমে গেছে,এই বার না হয় আগের জায়গায় গিয়ে দাড়াই। কিন্তু মেয়েটি তা বলছে না। নিরবতা কাটিয়ে নিলয় বলে বসলো, আপনার নামটা কি জানতে পারি? মেয়েটি মুছকি হেসে বলল ,নীলা।বলেই চলে যাচ্ছে। সামনে যাত্রীদের ভিড়,ভিড় ঠেলে বাসে উঠতে হবে। অনেক্ষন অপেক্ষার পর বাস এলো।


নিলয় দাড়িয়ে রইলো। তার চোখের সামনে দিয়ে নীলার বাস চলে যাচ্ছে। তার কাছে ঐ খনিক ক্ষনের মুহূর্তটা চির অমলিন হয়ে থাকবে। সে আরেকবার বাসটার দিকে তাকায় এই ভেবে যদি বাসটা থেমে যায়, নীলা বের হয়ে এসে তার হাতটি ধরে। ভাবতেই যেন কেমন উদাস হয়ে গেল নিলয়। এসব তো শুধু গল্পেই সম্ভব।
পথ চলতে শুরু করে নিলয়। মনে মনে ভাবে, ক্ষনিকের এই গল্পটা হয়ত আরও সুন্দর হতে পারতো!!! আকস্মিক নিলয় তার পাশে কার যেন অস্তিত্ব অনুভব করল। মুহূর্তের মধ্যেই যেন সে আকাশ থেকে পড়লো। নীলা তার পাশেই দাঁড়ানো। কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না তার নিজের চোখকে। নিলয় আরেকবার তার হাতে চিমটি কাটল। আহ করে আওয়াজ করতেই নীলা জোরে হেসে দিলো।




নিলয় আর নীলা রাস্তা দিয়ে হাঁটছে, বন্ধুর ফোন এসেছিল, নিলয় বলে দিয়েছি বৃষ্টির কারনে আজ আর আসা হবে না। রংধনুর সাত রঙে নীলাকে সাজিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে তার। ঝিরঝিরি বৃষ্টির মাঝে অবাক হয়ে আলো আর পানির খেলা দেখছে তারা দুজন।

অহর-নিশি


-জান জানো বাবা না তোমাদের বাসায় আমাদের বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে।
-সত্যি বলছো?
-হ্যাঁ তো জান। সত্যি সত্যি সত্যি।
মাহফুজের চোখ ছলছল করে উঠলো। পার্কের মধ্যেই অনন্যাকে জড়িয়ে ধরে কয়েক ফোটা অশ্রু বিসর্জিত করলো মাহফুজ।

কলেজে ২য় বর্ষে থাকাকালীন সময়ে অনন্যার সাথে পরিচয় হয়। বন্ধুদের চোখে মোটামুটি সুন্দরি হলেও মাহফুজের নিকট স্বর্গীয় অপ্সরীর মতোই লাগতো অনন্যাকে। অবাক করা তার মুখের হাসি দেখে যেকোন ছেলের হৃদক্রিয়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হতে পারে বলে মাহফুজের ধারনা। অনন্যার বড় বড় দুটি চোখের ঢিপঢিপ চাহনিতে মাহফুজ অনেক বারই শহীদ হয়েছে। আবার সেই শহীদ শরীরে প্রান ফিরে এসেছে সেই ঢিপঢিপ চাহনী চোখওয়ালীর কণ্ঠে আদরের ডাকটা শুনে- "এই জান,কি হল তোমার!!! এভাবে কি কেউ কাউকে দেখে!!! মাহফুজ মুচকি হেসে বলে-

" কে বলে শারদশশী-সে মুখের তোলা,
পদনখে পড়ে আছে-তার কত গুলা।"

অশ্রুতে ভিজে যায় অনন্যার চোখ। মাহফুজ আলতো করে হাত বুলিয়ে চোখ মুছে দেয়।


মাহফুজের বাসা থেকে অনন্যার বাবার পাঠানো বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হয়। খুবই উচ্চ বংশের ছেলে মাহফুজ। তাই তথাকথিত রীতিনীতি এখনো পুরোপুরি দমিত হয়নি এই পরিবার থেকে। আর এর ফলেই এই প্রত্যাখ্যান পর্ব।

অনন্যা চলো আমরা পালিয়ে বিয়ে করে ফেলি। বাসা বাঁধবো দূর পর্বতের কোন এক দেশে। মেঘের ভেলায় করে ভেসে বেড়াবো দুজন। যখন বাতাসের নাউয়ে করে বৃষ্টির ফোটা দুজনকে ভিজিয়ে দিবে,তখন তোমায় জড়িয়ে ধরে কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলবো,বউ তোমাকে না অনেক ভালবাসি। যখন চাঁদনী রাতে পুরো পর্বত শাঁ-শাঁ করবে,তখন দুজনে মুখরিত হয়ে জ্যোৎস্নাস্নানে ব্যাস্ত থাকবো। নদীর পাড়ে বসে অবাক হয়ে তুমি যখন ঢেউ আর আলোর খেলা দেখায় মগ্ন থাকবে,তখন তোমার কোলে মাথা রেখে অপলক দৃষ্টিতে তোমায় দেখবো।হঠাৎ ধমকা বাতাস এসে আমাদেরকে রাঙিয়ে দিয়ে যাবে তার সাত রঙা রঙে। হবো আমরা সাত রঙে রাঙ্গা অচিন পাখি। বলো যাবে আমার সাথে?
অনন্যা আর বসে থাকতে পারল না। উঠে দারিয়েই হাঠা শুরু করলো। যাবার সময় বিড়বিড় করে বলে গেল-তোমাকে আজীবন ভালবেসে যাবো। বাবা-মাকে কষ্ট দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।মাহফুজ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।বিকেল,সন্ধ্যা আর রাত গড়িয়ে কখন যে ভোর হয়ে গেল,টেরই পেলো না মাহফুজ। চোখের অবিরাম বর্ষা তাকে হয়তো আর কোনদিন ক্ষান্ত দিবে না। হয়তো তাকে নির্জনে চোখের এই অবুঝ ধারার সাথে খেলা খেলে যেতে হবে সারা জীবন।

কিছু দিন পর অনেকটা জেদ করে অনন্যার ফ্যামিলি এলাকার এক বড় ভাইয়ের সাথে বিয়ে ঠিক করে অনন্যার। মাহফুজ অনেকবার অনন্যার সাথে দেখা করতে চেয়েছিলো কিন্তু অনন্যা শুনেনি। তার সাথে আর কখনই যোগাযোগ করেনি। মাহফুজ পাশের বাসায় ফোন করে ওকে দিতে বলত। ওপাশ থেকে অনন্যা বলতো মাহফুজের সাথে আর কখনো কথা বলতে চায় না।
ওদের বিয়ের দিনটা মাহফুজের দেখা হয়নি। আগের দিন তার ছোট বোনটার বাচ্চা হয়ার পরে খিচুনি হয়। এম্বুলেন্স আনা হয়। মাহফুজ দৌড়ে পানি কিনে আনতে যেয়ে চোখ আটকে গেলো। অনন্যার বাবা অনন্যার বিয়ের ফল কিনছে ।মাহফুজ কয়েক মুহূর্তের জন্য নিজেকে সামলাতে পারলো না। চোখ দিয়ে অবিরাম বর্ষণ হতে লাগলো,বোন একদিকে মারা যাচ্ছে , অন্যদিকে ওদের আয়োজন। বোনকে নিয়ে হসপিটালে এক সপ্তাহ ছিলো মাহফুজ। অবস্থা এত খারাপ ছিল যে ডাক্তার ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যেতে বলেছিল।ওর কাজিন সেখানে ছিল। ও বড় সব ডাক্তার দিয়ে ট্রিটমেন্ট শুরু করে। তিন দিন পরে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠে বোনটা।মাহফুজ মেডিকেলের তিনতলার বারান্দায় বসে একের পর এক সিগারেট টানতো সারারাত আর একের পর এক মৃত মানুষ দেখতো। তারপরে যখন বাসায় চলে আসে,তখন ও আর নিজেকে বেঁধে রাখতে পারতো না। মনে হতো এই সিঁড়ি বেঁয়ে ছাদে যেয়ে অনন্যাকে দেখছে অথবা ঘরের মধ্যে ফিসফিস করে অনন্যা তাকে ডাকছে। এসব কিছুই অসহ্য হয়ে উঠে। কেন যেন নিজেকে মেরে ফেলর ইচ্ছে জন্মালো তার অবুঝ মনটায়। কিছুক্ষন পরই বাবা-মার কথা,পরিবারের সবার কথা ভেবে থেমে যেতো।

তিন মাস পর মাহফুজ দেশের গন্ডি পেড়িয়ে পাড়ি জমালো অচেনা এক দেশে- নিজের জীবন থেকে কালো একটি অধ্যায়ের ইতি টানতে। যেখানে কেউ তাকে জান বলে ডাকার থাকবে না। থাকবে না কোন সৃতি জড়ানো জায়গা।


প্রায় তিন বছর পর মাহফুজ এখনো তার সৃতির ভেলায় চড়ে অতীতের সপ্নমাখা দিনগুলোতে চলে যায়। হঠাৎ তার চোখ জলে ভিজে যায়। মাহফুজ যেন বিড়বিড় করে কি বলতে থাকে-"অনন্যা তোমাকে আমি আগেও ঘৃণা করতাম,এখনও করি,সারা জীবন করবো "

উৎসর্গ-আমার প্রিয় রিয়েল ডেমন ভাইয়া

রবিবার, ১৪ আগস্ট, ২০১১

এতটুকোও মূল্য দিতে পারছি কি?


বাসা থেকে বের হতেই দেখা হয়ে গেল প্রবাসী এক দম্পতির সাথে।দেশে এসেছে,এখানেই স্থায়ীভাবে থাকার বন্দোবস্ত করছে।ফুটফুটে একটা সন্তান কোলে নিয়ে হাঁটছে  জুলি ভাবি।লাল শাড়ি পরিহিত অবস্থায় তাকে কেউ দেখলে বুঝতেই পারবে না যে,এই হচ্ছে সেই জুলি ভাবি যে কিনা তার সমস্ত স্বাদ-আলহাদ,পরিবার,জাতীয়তা,ধর্ম সব ত্যাগ করে এক ভিনদেশে পাড়ি জমিয়েছে শুধু মাত্র তার ভালবাসার মানুষটির উপর তার প্রগাড় ভালবাসা আর বিশ্বাসের কারনে।তার মধ্যে নেই কোন সংকোচ,নেই কোন হাহাকার।শুধু মাত্র নিজের ভালবাসার উপর পূর্ণ বিশ্বাস থাকলেই এমন অটল চিত্তের অধিকারিণী হওয়া যায়।হাসি মুখে বিদায় দিলাম তাদের আর বললাম কখনো অবসর পেলে আমার গরীবখানায় এসে একবার দেখা করে যেতে।বলে আমি আমার কাজের উদ্দেশ্যে রউনা হলাম।

কিছু দিন পর,ভর দুপুর বেলা,আনুমানিক ৩-৩.৩০ নাগাদ কলিংবেলের আওয়াযে ঘুম ভাঙল।আমি একা মানুষ।এই দুপুর বেলায় কে আসলো!!!!অবাক হলাম !আর তাছাড়া ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলতে হবে বলে একটু বিরক্ত হলাম বটে।যাই হোক,সব বিরক্তি ঝেড়ে ফেলে দিয়ে দরজা খুললাম।খুলেই আশ্চর্য হলাম!!!!একি,হাসান ভাই যে,সাথে তার ফুটফুটে বাচ্চা আর ভাবিও আছেন।উনাদের দেখেই খুখে হাসি চলে আসলো।এমনিতেই একা মানুষ।পরিবার পরিজন বলতে এক দূর সম্পর্কের চাচা আছেন।তাও আবার গ্রামে থাকেন।কখনো সময় করে আমাকে দেখতেও আসা হয় না।তাই খুশির মাত্রাটা একটু বেশিই হল উনাদের দেখে।ভেতরে এনে বসালাম উনাদের।হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে দেখি বাবুটা আমার ডাইরী নিয়ে নাড়াচাড়া করছে,আর ভাবি তা দেখছেন।
-শোনলাম ভাবি নাকি বাংলা শিখছেন,কতটুকু আয়ত্ত করতে পারলেন?
-এই তো কিছু দিন হল মাত্র শিখা শুরু করলাম।হয়তো শিখে ফেলবো খুব শীঘ্রই। (নুতুন নুতুন ভাষা শিখছেন,তাই শুনতে একটু অদ্ভুত লাগছিল)
-হা,তাই যেন হয়।আচ্ছা আপনি আইরিশ হয়ে বাংলা ভাষা শিখতে কোন সমস্যা হচ্ছে নাতো?
-না,তেমন কোন সমস্যা হচ্ছে না,তবে উচ্চারণে একটু অসুবিধে হয়।এই আর কি।
-ভাবি আপনি কি জানেন,ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক থেকে বাংলা ভাষার স্থান ৫ম???
-তাই নাকি?জানতাম নাতো।এই তুমি না এত বড় সাংবাদিক! আমাকে তো কখনো তোমাদের ভাষা সম্পর্কে বল নি।
( আপনাদেরকে বলে রাখা ভাল যে,হাসান ভাই দেশ বরেণ্য সাংবাদিক।তার প্রচারিত  একটি প্রতিবেদন এক বিদেশী সংবাদ মাধ্যমে সাড়া ফেলে দেয়।খুবই গুনি বেক্তিত্ব উনি )
-ভাবি ভাইয়ের উপর রাগ করবেন না।ভাই ব্যাস্ত থাকেন।তাই হয়তো বলার সুযোগ হয়ে উঠে নি।আজ আপনি একদম ঠিক জায়গায় এসেছেন,আপনাকে আজ আমাদের দেশের ভাষা সম্পর্কে কিছু বলার সুযোগ পেয়ে নিজেকে বেশ ধন্য মনে হচ্ছে।আপনি জানেন বর্তমানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যা ৬৮২ কোটি ৯৪ লাখ। এরা প্রায় ৬ হাজার ভাষায় কথা বলে।এদের মধ্যে বাংলা ৫ম।আর বাংলা ভাষাভাষীর মানুষ হচ্ছে প্রায় ২৫ কোটি।
-তাই নাকি!তাহলে তো আমি এই ভাষায় কথা শিখছি বলে নিজেকে গর্বিত মনে করতে পারি। ( ভাবীর চোখে-মুখে বিস্ময় আর খুশির আবাস দেখা গেল )
-হা ভাবি,তাই।১৯৯৯ সালে প্রকাশিত The Summer Institute of Linguistics এর হিসেবে অনুয়ায়ী ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক থেকে বাংলার অবস্থান ৪র্থ।" শুধু বাংলাদেশের মানুষই যে এ ভাষায় কথা বলে তা নয় বরং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুর, মণিপুর,বিহার ও উড়িষ্যা এবং মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের রোহিঙ্গারাও বাংলা ভাষায় কথা বলে। আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিয়নে বাংলাকে ২য় সরকারী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে সেদেশের জনগণ বাংলাভাষা শিক্ষা করছে।
এই কথা শোনার পর ভাবির চোখ ছলছল করে উঠলো।ভাবী বলে উঠলেন
-এই তুমি কি বলতো,এতদিন আমাকে তোমাদের দেশের ভাষা সম্পর্কে কিছুই বললে না।যাও তোমার উপর রাগ করলাম।
একজন ভিনদেশি মানুষের আমাদের দেশের ভাষা,বাংলা ভাষা সম্পর্কে এত আগ্রহ আর কৌতুহল দেখে আপ্লুত হলাম!মনে মনে ভাবলাম,আমরা এখন কোন পরিস্থিতিতে আছি?বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করতে গিয়ে বাঙালীরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন,আমরা কি তার এতটুকোও মূল্য দিতে পারছি?
হাসান ভাই এবং ভাবিকে বিদায় দিয়ে ব্যাস্ত হয়ে গেলাম নিজের জীবনে।প্রায়ই হাসান ভাইয়ের লিখা আর্টিকেল পড়ে ভাবতাম পৃথিবীতে উনাদের মতো মানুষের বড্ড অভাব।দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম আর এই ভেবে সান্ত্বনা পেতাম যে দেশে ভাল মানুষ এখনো বিলুপ্ত হয়ে যায় নি।

আজ প্রায় পাঁচ বছর হল হাসান ভাই আর ভাবি এই দেশে স্থায়ীভাবে থাকা শুরু করেছেন।ভাবি এখন খুব ভাল বাংলা বলতে ও লিখতে পারেন।উনাদের ফুটফুটে বাচ্চাটা এখন স্কুলে যায়।গিয়েছিলাম কিছুদিন আগে উনাদের বাসায়।ভাবির শাড়ি পড়া দেখলে কেউ বলতেই পারবে না যে উনি আইরিশ।ঠিক যেন অবিকল গ্রামের বউদের মতো গুছিয়ে শাড়ি পড়েন।আর উনার বাংলা বলা অনেকটা বাঙ্গালীদের মতই স্পষ্ট হয়ে এসেছে।

আমি ভেবে প্রায়ই অবাক হই,একটা মানুষ কি করে নিজের সব কিছু ছেড়ে দিয়ে অচেনা এক দেশে পাড়ি জমায়?তাও একজন ভিনদেশেবাসীর সাথে।ভাবি আর চোখ ভিজে যায়।কতই না সুন্দর এই ভালবাসা!!উনারা শত বছর ঠিক এই ভাবেই ভালবাসার বাঁধনে বাঁধা থাকুক এই প্রার্থণা করি।কিন্তু ভাল মানুষ জন খুব বেশি দিন বাঁচার সুযোগ পায় না।হঠাৎ এক সড়ক দুর্ঘটনার স্পটেয় মর্মান্তিকভাবে শহীদ হন বিশ্ববরেণ্য সাংবাদিক হাসান মাহমুদ।আর ভাবি জুলিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।পরদিন  হাসপাতালে ভাবি জুলিও উনার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

খুব সহজেই হারিয়ে গেল দুটি তরতাজা প্রাণ আর তাদের প্রগাড় ভালবাসা।যে জুলি কিনা তার সব ছেড়ে আমাদের এই মাতৃভূমিতে পা রাখলো,আমাদের দেশ আর মাতৃভাষাকে ভালবাসল,আমরা সেই জুলিকে ধরে রাখতে পারলাম না।আমাদের মতো অভাগা আর কেউ কি আছে!!!ভাবতে ভাবতে চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পরতে লাগলো।পানি মুছে ছুটলাম আমার ব্যাস্ত জীবনের গ্লানি টানতে।আর ঠিক এভাবেই হারিয়ে যায় আমাদের খুব প্রিয় আর কাছের মানুষগুলো।

উৎসর্গ-আশফাক মুনীর মিশুক,তারেক মাসুদ ও তার স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ

বুধবার, ২৭ জুলাই, ২০১১

নোনা প্রতিধ্বনি

এই শুভ্র উঠ ঘুম থেকে,অনেক তো ঘুমালি,এখন একটু চোখ মেল,ক্লাসের জন্য দেরী হয়ে যাবে যে। উঠ বলছি। আর তুমিই বা কি রকম পিতা বলতো। ছেলের ক্লাস আছে,আর তুমি ঘুমুচ্ছো ছেলেকে নিয়ে। তোমাদেরকে নিয়ে আর পারি না। ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল পিতা-পুত্রের মাঝখানে। আর স্মৃতির পাতা আউড়াতে লাগলো।

এই শুভ্র তোর কি সেই প্রথম স্কুলে যাওয়ার কথা মনে আছে? তুই কতই না কেদেছিলি ঐদিন। বোকা ছেলে আমার। আমি তোকে অনেক বুঝিয়ে নিয়ে গেলাম। আর তুই আমার মাঝের আঙ্গুলটা তোর ছোট হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে টিপটিপ পা ফেলে চলেছিলি আমার সাথে। আর ক্লাসে ঢুকে তুই তো ভয় পেয়ে বের হয়ে এসেছিলি, আমিই তো তোকে ক্লাসে নিয়ে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। মনে পড়ে তর ঐ দিনের কথা? মনে আছে রাজু নামের একটা ছেলে তোকে পেছন থেকে ধাক্কা মেরে দৌড়ে পালাত। আর তুই গাল ফুলিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসে থাকতি। আমার নাদুশ-নুদুশ সেই ছেলেটা এখন কত বড় হয়ে গেছে!!!

পুরনো দিনের কথা বলতে বলতেই মুখে হাসির ছাপ আর চোখের কোণায় পানি জ্বলজ্বল করে উঠলো। চোখ মুছে আবার বলতে লাগলো,যেদিন তুই প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ট্যালেন্টফুলে বৃত্তি পেলি, সেইদিন আমি আর তোর বাবা কতই না খুশি হয়েছিলাম। তুই দৌড়ে এসে আমাদের জড়িয়ে ধরলি। তোর বাবার চোখ দিয়ে অনবরত ফোটায় ফোটায় পানি ঝরছিল, তোর বাবাকে আমি সেই প্রথম কাঁদতে দেখেছিলাম। আর তোর বাবা কি করলো,উল্টো আমাকে জিজ্ঞেস করে বসলো "তুমি কাঁদছো কেন? আমাদের ছেলে যে বৃত্তি পেয়েছে, এতে তো খুশি হবার কথা।" আমি হেসে বলতে লাগলাম, তাহলে তুমি কেন কাঁদছ?!?!?!


আর এই তুমি আমার কথা শুনে হাসছো?!?!?!
প্রথম যেদিন আমাকে প্রপোজ করতে এসেছিলে তখন তো হাত-পা অনবরত কাপাচ্ছিলে। আর আমার সব বান্ধবীরা তোমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। আর হাসবেই বা না কেন? তুমি কি পরিস্থিতিটাই না তৈরি করেছিলে। হাতে একটি লাল গোলাপ নিয়ে রাস্তায় একটি মেয়ের সামনে দাড়িয়ে ঐভাবে কাঁপতে থাকলে তো,যে কেউই হেসে ফেলবে। পাগল একটা!! জানো আমিও না হেসেছিলাম তোমার ঐ পাগলামি দেখে। একদম বোকা স্বভাবের ছিলে তুমি। তবে এখনও তো কম বোকা নউ। কথা গুলো বলতে বলতে চোখগুলো ভিজে গেলো লাবণ্যের।

তোমার মনে আছে সেই দিনের কথা, আমারা প্রথম যেদিন একসাথে বের হলাম। বিকেলের খানিকটা রোদ আমাদের উপর ঠুকরে পড়ছিল। আর আমরা জলের উপর বাতাসের নাউয়ে ভেসে বেড়াচ্ছিলাম। ধমকা হাওয়ার পাল বেয়ে চলে যাচ্ছিলাম অসীমে, আর আমি বারবার হারিয়ে যাচ্ছিলাম তোমাতে।তোমার ঐ চোখে। তুমি আমাকে ভিজিয়ে দিচ্ছিলে ছলছল নদীর ঐ পানি ছিটিয়ে। আমি মুগ্ধ হয়ে তা উপভোগ করছিলাম। হঠাৎ তুমি আমার হাতটি শক্ত করে ধরলে,আর তুমি কি করেছিলে মনে আছে? ত্মি  আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললা,আমার হাতটি কখনো ছেড়ো না।

চল্লিশ বছর পেড়িয়ে গেছে,লাবণ্য এখন বৃদ্ধা। তারপরও রোজ তার স্বামী আর ছেলের কবরের পাশে বসে পুরনো স্মৃতি তাড়া করে আসে। বাবা যুদ্ধে যাচ্ছে, তা দেখে যে তার নাইনে পড়ুয়া ছেলেটাও বায়না ধরলো যুদ্ধে যাবে বলে। তার আবদার কখনো বাবা-মা ফেলতে পারে না। পুত্রকে সাথে নিয়েই চলে গেলো যুদ্ধে। যাবার আগে লাবণ্যকে বলে গেল-"আমি আসবো তোমার শুভ্রকে সাথে নিয়ে, আর তোমার জন্য স্বাধীন একটা দেশ উপহার নিয়ে আসবো।" তারপর লাবণ্যের কানের কাছে এসে সেই প্রথম দিনের মত  ফিসফিস করে বললা,"আমার হাতটি কখনো ছেড়ো না কিন্তু।"

লাবণ্যের চোখ দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পানি পড়ছে। আর বিড়বিড় করে বলছে,ওগো,তোমার হাতটা আমি আজো ছাড়ি নি।

মঙ্গলবার, ১৯ জুলাই, ২০১১

নীলপদ্ম...


শীলার কবরকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আনন্দ।অশ্রুসিক্ত নয়নে আকাশের দিকে তার একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আবার কাঁদতেশুরু করলো।মনে হলো তার সব অভিমানগুলো প্রকাশ করলো।


কি ব্যাপার!!!আনন্দের তো এইখানে থাকার কথা না।কবরও জিয়ারত করার কথা না।সে যে হিন্দু!!!লোকে তাকে এইখানে এই অবস্থায় দেখলে কি ভাববে!!এই দিকে তার কোন পরোয়া নেই।সে আপন মনে কেঁদে চলছে।তার কান্নার শব্দে হয়তো শীলাও কেঁপে কেঁপে উঠছে।আনন্দের খুব ইচ্ছা করছে কবর খুঁড়ে দেখার শীলাও কি তার কান্নার শব্দে কাঁদছে কিনা।সেটা যে জানা তার জন্য খুব বেশি জরুরী।শীলা বলেছিলো সে কাঁদলে নাকি শীলাও কাঁদে।আনন্দের কান্নার তীব্রতা আরো অনেক গুন বেড়ে গেল।


কলেজে প্রথম বর্ষে পরিচয় শীলার সাথে।খুবই ভদ্র আর সুশীল একটি মেয়ে।দেখতে শুনতেও বেশ ভাল।এক সাথে একই স্যারের কাছে পড়তো বলে অদের সম্পর্কটা অন্যদের চেয়ে বেশ ভালো ছিল।তাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ত হতেও খুব বেশি সময় লাগলো না।


আনন্দ কেমন যেন পাগলাটে!!! সারাদিন শুধু উদ্ভট উদ্ভট কাণ্ড করে বেড়ায়।একবার স্যারের কাছে থেকে স্যারের হ্যান্ডনোট চুরি করায় কি বকুনিটাই না খেলো বেচারা আনন্দ!!!


আনন্দ সেই প্রথম থেকেয় শীলাকে পছন্দ করত।কিন্তু কখনো বালার সাহস হয় নি।সে জানে যে শীলা কখনোই তার এই ধরনের পাগলামি মেনে নেবে না।সে খুবই বাস্তববাদী একটি মেয়ে।তবে শীলার যে তার পাগলামি ভালো লাগত না,তা কিন্তু নয়।সে তার পাগলামিগুলোর প্রেমে পড়ে গেছে অনেক আগেই।আনন্দ একদিন তা বুঝতেও পারে---একদিন সে বাসায় মার সাথে কথা কাটাকাটি করে না খেয়ে কলেজে চলে আসে।এসে শীলাকে জিজ্ঞেস করে সে কোন খাবার এনেছে কিনা।শীলা ব্যাগ থেকে একটি অ্যাপেল বের করে আনন্দকে দেয়।আনন্দের চোখ দিয়ে তখন টপটপ করে পানি ঝরতে থাকে।শীলাও যেন কাঁদা শুরু করে দিলো আর বিড়বিড় করে বলতে লাগলো,জানিস আনন্দ তোর মন খারাপ থাকলে যে আমার ভীষণ খারাপ লাগে।আর তুই কাঁদলে যে আমারও ভীষণ কান্না পায়।


এর প্রায় তিন বছর পর,শীলাকে অপারেশনের জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।কি যেন এক ক্যানসারে ধরেছে তাকে।দেশে চিকিৎসা নেই।আনন্দকে কাছে ডেকে শীলা বলল,আমাকে একটা কথা দিবি?-তুই খুব ভালো একটা ছেলে।ভালো একটা মেয়ে দেখে বিয়ে করে ফেলিস।আর আমারে ভুলে যাইস।কথাগুলো বলতে বলতে শীলার চোখ দিয়ে গড়গড় করে পানি পরতে লাগলো।তার কান্না দেখে আনন্দ আবার নতুন করে তারে প্রেমে পড়ে গেলো।অব্যক্ত কিছু কথা রেখে চলে যাচ্ছে শীলা।পেছন থেকে আনন্দ দৌড়ে শীলাকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো,কিরে আমারে ছেঁড়ে থাকতে পারবি?একটুও কি কষ্ট হবে না তোর?শীলা আনন্দকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করে দিলো।আর অস্পষ্টভাবে কি যেন বলল।তবে আনন্দ যেন কেন মনে করল,শীলা অস্পষ্টভাবে তাকে বলছে,'আমি তোকে অনেক ভালবাসিরে।'


বিশ বছর পর এক ভরা পূর্ণিমা রাতে আনন্দ আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদ দেখছে আর বিড়বিড় করে বলছে" শীলা আমি তোর কথা রাখতে পারলাম না।আমাকে ক্ষমা করে দিস।"




বুধবার, ১৩ জুলাই, ২০১১

শঙ্খনীল ভালবাসা

বৃষ্টি ভেজা এক সকালে তমাল ব্যাথিতো মনে দরজার পাশে বসে আছে।আজ মৌমিতার আসার কথা।কিন্তু বৃষ্টির হাব-ভাব দেখে মনে হয়না যে খুব শীঘ্রই থামবে।তাই হয়তো মৌমিতারও আসা হবে না।মন খারাপ করে চুপটি মেরে বসে রইল তমাল।দূরে নারিকেল গাছের পাতা বেয়ে বৃষ্টির পানি পরার দৃশ্য দেখতে লাগলো।মনের মধ্যে কিছু অযাচিত প্রশ্ন উঁকি দিয়ে যাচ্ছে....

মৌমিতা!!!বৃষ্টি ভেজা স্নিগ্ধ এক বর্ষার সন্ধ্যায়,গোলাপি সিল্কের শাড়ি পড়ে,রাস্তার পাশে দাড়িয়ে থাকা অবস্থায় মৌমিতাকে প্রথম দেখতে পায় তমাল।পুরো শরীর বৃষ্টির পানিতে ভেজা।কপালে গোলাপি রঙের বড় একটি টীপ।বড় বড় দুইটি চোখ।বা-চোখের কোণে একটি জলবিন্দু চিকচিক করছে।কি অপূর্বই না লাগছে দেখতে।তমাল যেন ঐ জলবিন্দুর প্রেমে পড়ে গেলো!!!

তমাল মৌমিতার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।"বৃষ্টির পানি গায়ে লেগে থাকলে যে ঠাণ্ডা লেগে যাবে"এই বলে গাড়ি থেকে তোয়ালে এনে মৌমিতার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,চলুন আপনাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসি।

তমাল,মৌমিতা আর তার ছোট ভাইকে নিয়ে গাড়িতে।তমাল ড্রাইভিং করছে আর ওরা দুইজন পেছনের সিটে বসা।ওয়াচিং গ্লাস দিয়ে তমাল মৌমিতাকে দেখছে।বিধাতা তাঁর নিপুণ হাতে নিখুঁত করে বানিয়েছেন মৌমিতাকে।অবাক দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে মৌমিতা ! কি যেন দেখে হঠাৎ হেসে ফেললো।অসম্ভব রকম সুন্দর তার হাসি!!!তমাল অপলক দৃষ্টিতে তা দেখতে লাগলো।আর ভাবনার জগতে হারিয়ে গেলো।তার ভাবনায় ভারতচন্দ্রের সেই কবিতাটা চলে আসলো-

"কে বলে শারদশশী,সে মুখের তুলা
পদ নখে পড়ে আছে,তার কতগুলা।"

ভাবনার রেশ কেটে গেলো মৌমিতার কন্ঠ আকস্মিক কানে আসাতে-EXCUSE ME,আমাদের বাসা এসে পড়েছে,KINDLY নামিয়ে দিন।গাড়ি থেকে নেমে তমালকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেলো মৌমিতা,রেখে গেলো কিছু অনুভূতি।তমালের বুকের বাঁ-পাশটা একটু ব্যাথা করতে লাগলো।


মৌমিতার সাথে পরিচয় আজ প্রায় দুই বছর।ঐ দিনের মতো আজও প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে।বৃষ্টি হচ্ছে তমালের মনোকুঠিরের দেয়াল বেয়ে।আর উপচিয়ে পড়ছে কিছু নাম না জানা রং।মৌমিতাকে ভালোলাগার ব্যাপারটা অনেক আগেই ভালবাসাতে পরিণত হয়েছে।বারবার চেষ্টা করেও সে কথাগুলো মৌমিতাকে বলতে পারেনি।হয়তো কখনো পারবেও না!!!

তমালের হঠাৎ চোখ পড়লো দূর থেকে ভেসে আসা গোলাপি কিছু একটার দিকে।প্রবল বৃষ্টির কারনে বোঝা যাচ্ছে না।তবে তমালের কাছে আর অবোধ্য রইলো না যে,গোলাপি শাড়ি পড়ে মৌমিতা তাদের বাসায় আসছে।এতো বৃষ্টির মধ্যেও মৌমিতা তার সাথে দেখা করতে আসবে,তা তার জানা ছিল না।কাছে আসতেই সে দেখতে পেলো,গোলাপি রঙের শাড়ি আর বড় গোলাপি একটি টীপ পরিহিত অবস্থায় মৌমিতা।আজও তার বা-চোখের কোণে একটি জলবিন্দু চিকচিক করছে।আজও আবার এই জলবিন্দুর প্রেমে পড়তে ইচ্ছা করছে তমালের !!!

তমালকে দরজার পাশে বসে থাকতে দেখে মৌমিতা হাসিমাখা কন্ঠে বলতে লাগলো,তোমার সাথে আমার পরিচয়ের আজ দুই বছর পূর্ণ হল।তাইতো সেইদিনের মতো করে সেজে এসেছিলাম।কিন্তু দেখলে আজও বৃষ্টিটা আমাকে ভিজিয়ে দিলো।তোয়ালে নিয়ে আসো তো,গা মুছে ঘরে ঢুকব।

তমাল নিথর হয়ে বসে রইল।তার চোখের কোণে জলবিন্দু চিকচিক করছে।কিন্তু এইটা যে বৃষ্টির জলবিন্দু নয়!!!!

বৃহস্পতিবার, ৭ জুলাই, ২০১১

অন্তিম বিসর্জন

সব দিয়েও
    না পাহিবো তাহারে,
        ক্রন্দনরত মন-
           কি অন্তিম বিসর্জন!!!

হঠাৎ আসা এই প্লাবনে
    বৃষ্টিস্নান্ত এই লগনে,
        উঁকি দিয়ে সে যায়
            মনের অন্তরায়।

আচমকা এক ঝড়ের বেলায়
    তাহার-আমার মিলন মেলায়,
         অবুঝ মনের গহীন বনে-
শিহরন দিয়ে যায়।
     স্বর্গীয় অপ্সরীর ন্যায়
           সে নিজেকে লুকায়।

ক্ষণিক ক্ষণের ঐ লগন
     সৃতির ভেলায় চড়ে
          উঁকি দিয়ে যায়,
মৃদু যন্ত্রণা-
     বুকের মাঝে
          কাতরাইয়ে মারে হায়।