বুধবার, ২৭ জুলাই, ২০১১

নোনা প্রতিধ্বনি

এই শুভ্র উঠ ঘুম থেকে,অনেক তো ঘুমালি,এখন একটু চোখ মেল,ক্লাসের জন্য দেরী হয়ে যাবে যে। উঠ বলছি। আর তুমিই বা কি রকম পিতা বলতো। ছেলের ক্লাস আছে,আর তুমি ঘুমুচ্ছো ছেলেকে নিয়ে। তোমাদেরকে নিয়ে আর পারি না। ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল পিতা-পুত্রের মাঝখানে। আর স্মৃতির পাতা আউড়াতে লাগলো।

এই শুভ্র তোর কি সেই প্রথম স্কুলে যাওয়ার কথা মনে আছে? তুই কতই না কেদেছিলি ঐদিন। বোকা ছেলে আমার। আমি তোকে অনেক বুঝিয়ে নিয়ে গেলাম। আর তুই আমার মাঝের আঙ্গুলটা তোর ছোট হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে টিপটিপ পা ফেলে চলেছিলি আমার সাথে। আর ক্লাসে ঢুকে তুই তো ভয় পেয়ে বের হয়ে এসেছিলি, আমিই তো তোকে ক্লাসে নিয়ে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। মনে পড়ে তর ঐ দিনের কথা? মনে আছে রাজু নামের একটা ছেলে তোকে পেছন থেকে ধাক্কা মেরে দৌড়ে পালাত। আর তুই গাল ফুলিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসে থাকতি। আমার নাদুশ-নুদুশ সেই ছেলেটা এখন কত বড় হয়ে গেছে!!!

পুরনো দিনের কথা বলতে বলতেই মুখে হাসির ছাপ আর চোখের কোণায় পানি জ্বলজ্বল করে উঠলো। চোখ মুছে আবার বলতে লাগলো,যেদিন তুই প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ট্যালেন্টফুলে বৃত্তি পেলি, সেইদিন আমি আর তোর বাবা কতই না খুশি হয়েছিলাম। তুই দৌড়ে এসে আমাদের জড়িয়ে ধরলি। তোর বাবার চোখ দিয়ে অনবরত ফোটায় ফোটায় পানি ঝরছিল, তোর বাবাকে আমি সেই প্রথম কাঁদতে দেখেছিলাম। আর তোর বাবা কি করলো,উল্টো আমাকে জিজ্ঞেস করে বসলো "তুমি কাঁদছো কেন? আমাদের ছেলে যে বৃত্তি পেয়েছে, এতে তো খুশি হবার কথা।" আমি হেসে বলতে লাগলাম, তাহলে তুমি কেন কাঁদছ?!?!?!


আর এই তুমি আমার কথা শুনে হাসছো?!?!?!
প্রথম যেদিন আমাকে প্রপোজ করতে এসেছিলে তখন তো হাত-পা অনবরত কাপাচ্ছিলে। আর আমার সব বান্ধবীরা তোমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। আর হাসবেই বা না কেন? তুমি কি পরিস্থিতিটাই না তৈরি করেছিলে। হাতে একটি লাল গোলাপ নিয়ে রাস্তায় একটি মেয়ের সামনে দাড়িয়ে ঐভাবে কাঁপতে থাকলে তো,যে কেউই হেসে ফেলবে। পাগল একটা!! জানো আমিও না হেসেছিলাম তোমার ঐ পাগলামি দেখে। একদম বোকা স্বভাবের ছিলে তুমি। তবে এখনও তো কম বোকা নউ। কথা গুলো বলতে বলতে চোখগুলো ভিজে গেলো লাবণ্যের।

তোমার মনে আছে সেই দিনের কথা, আমারা প্রথম যেদিন একসাথে বের হলাম। বিকেলের খানিকটা রোদ আমাদের উপর ঠুকরে পড়ছিল। আর আমরা জলের উপর বাতাসের নাউয়ে ভেসে বেড়াচ্ছিলাম। ধমকা হাওয়ার পাল বেয়ে চলে যাচ্ছিলাম অসীমে, আর আমি বারবার হারিয়ে যাচ্ছিলাম তোমাতে।তোমার ঐ চোখে। তুমি আমাকে ভিজিয়ে দিচ্ছিলে ছলছল নদীর ঐ পানি ছিটিয়ে। আমি মুগ্ধ হয়ে তা উপভোগ করছিলাম। হঠাৎ তুমি আমার হাতটি শক্ত করে ধরলে,আর তুমি কি করেছিলে মনে আছে? ত্মি  আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললা,আমার হাতটি কখনো ছেড়ো না।

চল্লিশ বছর পেড়িয়ে গেছে,লাবণ্য এখন বৃদ্ধা। তারপরও রোজ তার স্বামী আর ছেলের কবরের পাশে বসে পুরনো স্মৃতি তাড়া করে আসে। বাবা যুদ্ধে যাচ্ছে, তা দেখে যে তার নাইনে পড়ুয়া ছেলেটাও বায়না ধরলো যুদ্ধে যাবে বলে। তার আবদার কখনো বাবা-মা ফেলতে পারে না। পুত্রকে সাথে নিয়েই চলে গেলো যুদ্ধে। যাবার আগে লাবণ্যকে বলে গেল-"আমি আসবো তোমার শুভ্রকে সাথে নিয়ে, আর তোমার জন্য স্বাধীন একটা দেশ উপহার নিয়ে আসবো।" তারপর লাবণ্যের কানের কাছে এসে সেই প্রথম দিনের মত  ফিসফিস করে বললা,"আমার হাতটি কখনো ছেড়ো না কিন্তু।"

লাবণ্যের চোখ দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পানি পড়ছে। আর বিড়বিড় করে বলছে,ওগো,তোমার হাতটা আমি আজো ছাড়ি নি।

মঙ্গলবার, ১৯ জুলাই, ২০১১

নীলপদ্ম...


শীলার কবরকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আনন্দ।অশ্রুসিক্ত নয়নে আকাশের দিকে তার একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আবার কাঁদতেশুরু করলো।মনে হলো তার সব অভিমানগুলো প্রকাশ করলো।


কি ব্যাপার!!!আনন্দের তো এইখানে থাকার কথা না।কবরও জিয়ারত করার কথা না।সে যে হিন্দু!!!লোকে তাকে এইখানে এই অবস্থায় দেখলে কি ভাববে!!এই দিকে তার কোন পরোয়া নেই।সে আপন মনে কেঁদে চলছে।তার কান্নার শব্দে হয়তো শীলাও কেঁপে কেঁপে উঠছে।আনন্দের খুব ইচ্ছা করছে কবর খুঁড়ে দেখার শীলাও কি তার কান্নার শব্দে কাঁদছে কিনা।সেটা যে জানা তার জন্য খুব বেশি জরুরী।শীলা বলেছিলো সে কাঁদলে নাকি শীলাও কাঁদে।আনন্দের কান্নার তীব্রতা আরো অনেক গুন বেড়ে গেল।


কলেজে প্রথম বর্ষে পরিচয় শীলার সাথে।খুবই ভদ্র আর সুশীল একটি মেয়ে।দেখতে শুনতেও বেশ ভাল।এক সাথে একই স্যারের কাছে পড়তো বলে অদের সম্পর্কটা অন্যদের চেয়ে বেশ ভালো ছিল।তাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ত হতেও খুব বেশি সময় লাগলো না।


আনন্দ কেমন যেন পাগলাটে!!! সারাদিন শুধু উদ্ভট উদ্ভট কাণ্ড করে বেড়ায়।একবার স্যারের কাছে থেকে স্যারের হ্যান্ডনোট চুরি করায় কি বকুনিটাই না খেলো বেচারা আনন্দ!!!


আনন্দ সেই প্রথম থেকেয় শীলাকে পছন্দ করত।কিন্তু কখনো বালার সাহস হয় নি।সে জানে যে শীলা কখনোই তার এই ধরনের পাগলামি মেনে নেবে না।সে খুবই বাস্তববাদী একটি মেয়ে।তবে শীলার যে তার পাগলামি ভালো লাগত না,তা কিন্তু নয়।সে তার পাগলামিগুলোর প্রেমে পড়ে গেছে অনেক আগেই।আনন্দ একদিন তা বুঝতেও পারে---একদিন সে বাসায় মার সাথে কথা কাটাকাটি করে না খেয়ে কলেজে চলে আসে।এসে শীলাকে জিজ্ঞেস করে সে কোন খাবার এনেছে কিনা।শীলা ব্যাগ থেকে একটি অ্যাপেল বের করে আনন্দকে দেয়।আনন্দের চোখ দিয়ে তখন টপটপ করে পানি ঝরতে থাকে।শীলাও যেন কাঁদা শুরু করে দিলো আর বিড়বিড় করে বলতে লাগলো,জানিস আনন্দ তোর মন খারাপ থাকলে যে আমার ভীষণ খারাপ লাগে।আর তুই কাঁদলে যে আমারও ভীষণ কান্না পায়।


এর প্রায় তিন বছর পর,শীলাকে অপারেশনের জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।কি যেন এক ক্যানসারে ধরেছে তাকে।দেশে চিকিৎসা নেই।আনন্দকে কাছে ডেকে শীলা বলল,আমাকে একটা কথা দিবি?-তুই খুব ভালো একটা ছেলে।ভালো একটা মেয়ে দেখে বিয়ে করে ফেলিস।আর আমারে ভুলে যাইস।কথাগুলো বলতে বলতে শীলার চোখ দিয়ে গড়গড় করে পানি পরতে লাগলো।তার কান্না দেখে আনন্দ আবার নতুন করে তারে প্রেমে পড়ে গেলো।অব্যক্ত কিছু কথা রেখে চলে যাচ্ছে শীলা।পেছন থেকে আনন্দ দৌড়ে শীলাকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো,কিরে আমারে ছেঁড়ে থাকতে পারবি?একটুও কি কষ্ট হবে না তোর?শীলা আনন্দকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করে দিলো।আর অস্পষ্টভাবে কি যেন বলল।তবে আনন্দ যেন কেন মনে করল,শীলা অস্পষ্টভাবে তাকে বলছে,'আমি তোকে অনেক ভালবাসিরে।'


বিশ বছর পর এক ভরা পূর্ণিমা রাতে আনন্দ আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদ দেখছে আর বিড়বিড় করে বলছে" শীলা আমি তোর কথা রাখতে পারলাম না।আমাকে ক্ষমা করে দিস।"




বুধবার, ১৩ জুলাই, ২০১১

শঙ্খনীল ভালবাসা

বৃষ্টি ভেজা এক সকালে তমাল ব্যাথিতো মনে দরজার পাশে বসে আছে।আজ মৌমিতার আসার কথা।কিন্তু বৃষ্টির হাব-ভাব দেখে মনে হয়না যে খুব শীঘ্রই থামবে।তাই হয়তো মৌমিতারও আসা হবে না।মন খারাপ করে চুপটি মেরে বসে রইল তমাল।দূরে নারিকেল গাছের পাতা বেয়ে বৃষ্টির পানি পরার দৃশ্য দেখতে লাগলো।মনের মধ্যে কিছু অযাচিত প্রশ্ন উঁকি দিয়ে যাচ্ছে....

মৌমিতা!!!বৃষ্টি ভেজা স্নিগ্ধ এক বর্ষার সন্ধ্যায়,গোলাপি সিল্কের শাড়ি পড়ে,রাস্তার পাশে দাড়িয়ে থাকা অবস্থায় মৌমিতাকে প্রথম দেখতে পায় তমাল।পুরো শরীর বৃষ্টির পানিতে ভেজা।কপালে গোলাপি রঙের বড় একটি টীপ।বড় বড় দুইটি চোখ।বা-চোখের কোণে একটি জলবিন্দু চিকচিক করছে।কি অপূর্বই না লাগছে দেখতে।তমাল যেন ঐ জলবিন্দুর প্রেমে পড়ে গেলো!!!

তমাল মৌমিতার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।"বৃষ্টির পানি গায়ে লেগে থাকলে যে ঠাণ্ডা লেগে যাবে"এই বলে গাড়ি থেকে তোয়ালে এনে মৌমিতার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,চলুন আপনাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসি।

তমাল,মৌমিতা আর তার ছোট ভাইকে নিয়ে গাড়িতে।তমাল ড্রাইভিং করছে আর ওরা দুইজন পেছনের সিটে বসা।ওয়াচিং গ্লাস দিয়ে তমাল মৌমিতাকে দেখছে।বিধাতা তাঁর নিপুণ হাতে নিখুঁত করে বানিয়েছেন মৌমিতাকে।অবাক দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে মৌমিতা ! কি যেন দেখে হঠাৎ হেসে ফেললো।অসম্ভব রকম সুন্দর তার হাসি!!!তমাল অপলক দৃষ্টিতে তা দেখতে লাগলো।আর ভাবনার জগতে হারিয়ে গেলো।তার ভাবনায় ভারতচন্দ্রের সেই কবিতাটা চলে আসলো-

"কে বলে শারদশশী,সে মুখের তুলা
পদ নখে পড়ে আছে,তার কতগুলা।"

ভাবনার রেশ কেটে গেলো মৌমিতার কন্ঠ আকস্মিক কানে আসাতে-EXCUSE ME,আমাদের বাসা এসে পড়েছে,KINDLY নামিয়ে দিন।গাড়ি থেকে নেমে তমালকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেলো মৌমিতা,রেখে গেলো কিছু অনুভূতি।তমালের বুকের বাঁ-পাশটা একটু ব্যাথা করতে লাগলো।


মৌমিতার সাথে পরিচয় আজ প্রায় দুই বছর।ঐ দিনের মতো আজও প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে।বৃষ্টি হচ্ছে তমালের মনোকুঠিরের দেয়াল বেয়ে।আর উপচিয়ে পড়ছে কিছু নাম না জানা রং।মৌমিতাকে ভালোলাগার ব্যাপারটা অনেক আগেই ভালবাসাতে পরিণত হয়েছে।বারবার চেষ্টা করেও সে কথাগুলো মৌমিতাকে বলতে পারেনি।হয়তো কখনো পারবেও না!!!

তমালের হঠাৎ চোখ পড়লো দূর থেকে ভেসে আসা গোলাপি কিছু একটার দিকে।প্রবল বৃষ্টির কারনে বোঝা যাচ্ছে না।তবে তমালের কাছে আর অবোধ্য রইলো না যে,গোলাপি শাড়ি পড়ে মৌমিতা তাদের বাসায় আসছে।এতো বৃষ্টির মধ্যেও মৌমিতা তার সাথে দেখা করতে আসবে,তা তার জানা ছিল না।কাছে আসতেই সে দেখতে পেলো,গোলাপি রঙের শাড়ি আর বড় গোলাপি একটি টীপ পরিহিত অবস্থায় মৌমিতা।আজও তার বা-চোখের কোণে একটি জলবিন্দু চিকচিক করছে।আজও আবার এই জলবিন্দুর প্রেমে পড়তে ইচ্ছা করছে তমালের !!!

তমালকে দরজার পাশে বসে থাকতে দেখে মৌমিতা হাসিমাখা কন্ঠে বলতে লাগলো,তোমার সাথে আমার পরিচয়ের আজ দুই বছর পূর্ণ হল।তাইতো সেইদিনের মতো করে সেজে এসেছিলাম।কিন্তু দেখলে আজও বৃষ্টিটা আমাকে ভিজিয়ে দিলো।তোয়ালে নিয়ে আসো তো,গা মুছে ঘরে ঢুকব।

তমাল নিথর হয়ে বসে রইল।তার চোখের কোণে জলবিন্দু চিকচিক করছে।কিন্তু এইটা যে বৃষ্টির জলবিন্দু নয়!!!!

বৃহস্পতিবার, ৭ জুলাই, ২০১১

অন্তিম বিসর্জন

সব দিয়েও
    না পাহিবো তাহারে,
        ক্রন্দনরত মন-
           কি অন্তিম বিসর্জন!!!

হঠাৎ আসা এই প্লাবনে
    বৃষ্টিস্নান্ত এই লগনে,
        উঁকি দিয়ে সে যায়
            মনের অন্তরায়।

আচমকা এক ঝড়ের বেলায়
    তাহার-আমার মিলন মেলায়,
         অবুঝ মনের গহীন বনে-
শিহরন দিয়ে যায়।
     স্বর্গীয় অপ্সরীর ন্যায়
           সে নিজেকে লুকায়।

ক্ষণিক ক্ষণের ঐ লগন
     সৃতির ভেলায় চড়ে
          উঁকি দিয়ে যায়,
মৃদু যন্ত্রণা-
     বুকের মাঝে
          কাতরাইয়ে মারে হায়।

বুধবার, ৬ জুলাই, ২০১১

চূর্ণ অস্থি

বুকের ভেতর চূর্ণ অস্থি
মাঝখানটায় ঘাঁ,
অনেক যতনে বেঁড়ে উঠছে সেখানে
রক্তের ফোঁয়ারা।

হৃদয় ভাঙ্গা সখার মত হঠাৎ 
সিউঁরে ওঠে গাঁ,
বুক ফাটা আর্তনাদে
অবলিলায় কেঁদে উঠা।

বুকের ভেতর চূর্ণ অস্থি
তার মাঝখানটায় ঘাঁ।

অজানা এক বাঁধন

অন্ধকার ঘরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তমাল।অঝোর বৃষ্টির ফোটা বাতাসের নাওয়ে ভেসে তমালের শরীরটা ভিজিয়ে দিচ্ছে।কিন্ত সে এতটুকুও নড়ছে না।মনভরে প্রকৃতির এই নিদারুণ খেলা দেখতে লাগলো।আর একটি হাত জানালার বাইরে মেলে ধরে অতীতের স্মৃতিগুলোকে তাড়া করতে লাগলো।

নীলিমা!!!নীলিমারা এই শহর ছেঁড়ে চলে গেছে প্রায় দেড় বছর।তবু আজও তার অশ্রুমাখা চেহারাটা ভেসে উঠে চোখের সামনে।কতই না অতৃপ্ত স্বপ্ন অংকুরেই ঝরে গেলো হঠাৎ আসা প্লাবনে।

তমালের স্বপ্নগুলো কেমন যেন ছন্নছাড়া।তার নির্ঘুম রাতের সঙ্গী অসীম রহস্যের রাতের আকাশ।কখনো মেঘলা আবার কখনো ভরা পূর্ণিমা।সব কিছুই যে তার খুব পরিচিত।আকাশের দিকে তাকিয়ে সে যেন কাকে খুঁজে বেড়ায়।

ঐ দিন শুক্রবার।পাশের ফ্ল্যাটের রফিক আঙ্কেল আকস্মিকভাবে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নেন।রেখে যান ১৭ বছরের মেয়ে নীলিমা আর ৪ বছরের ছেলে শুভ কে।নিষ্পাপ দুইটি মুখ।

আঙ্কেল মারা গেছেন প্রায় দুই বছর।আজও তমাল ঐ দিনের কথা ভুলতে পারে না।মনে পড়লেই বুকের ভেতর কেমন যেন অজানা ব্যাথা শুরু হয়।ভয়াবহ ব্যাথা।এর কারনটা তমাল এখনও খুঁজে বের করতে পারে নি।

তমাল সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে।কান্নার শব্দ ভেসে আসছে ঘরের ভিতর থেকে।ঘরে অনেক লোকের সমাগম।ঢুকতেই আন্টিকে চোখে পড়লো।আন্টি আঙ্কেলের মৃত শরীরটাকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো আর্তনাদ করছে।কিছু আত্মীয় উনাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করছে।কিন্ত কোন লাভ হচ্ছে না।হঠাৎ করে শুভকে চোখে পড়ল।বাবা মারা যাওয়ার ব্যাপারটা তার কাছে বোধগম্য নয়।তাই সে এত লোকের মাঝেও তার খেলনার গাড়ি নিয়ে খেলছে।শুভর দিকে তাকিয়ে আন্টি আরো শব্দ করে কাঁদতে শুরু করলো।কেমন যেন শোকের ছায়া চারদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে।

কি ব্যাপার নীলিমাকে দেখা যাচ্ছে না কেনো?আরে ঐতো মেধাবী ছাত্রী নীলিমা।অপরূপ সুন্দরী।কলেজের এর 1st গার্ল।কত গর্বই না বাবার তাকে নিয়ে।দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে এক কোণায়,চোখের অবিরাম অশ্রুধারা গাল বেয়ে পরছে।কিন্ত মুখে একটি শব্দও নেই।নীলিমা বিড়বিড় করে কি যেনো বলছে।হয়তো বলছে "বাবা,আমার যে আর মাত্র ৬ দিন পর HSC এর রেজাল্ট দিবে,তুমি কি জানো না?জানলে কেন তোমার মেয়ের রেজাল্ট না দেখে চলে গেলে?"

হঠাৎ খুব শব্দ করে কাঁদতে শুরু করলো নীলিমা।বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে কাঁদতে লাগলো।চোখ বেয়ে অবিরাম বর্ষণ হচ্ছে।কি নিষ্পাপ একটি মেয়ে কাঁদছে।তমালের ইচ্ছা করছে নীলিমাকে জড়িরে ধরে ওর কান্না থামানো।কিন্তু কখনো কখনো সব ইচ্ছা পূরণ হয় না।নীলিমার অশ্রুশ্রান্ত চোখের দিকে তাকাতেই তমালের মনে কিঞ্চিৎ ব্যাথা অনুভূত হলো।সেই ব্যাথাই আজ অনেক বড় আকার ধারন করেছে।

তমাল তার অন্য হাতটাও জানালার বাইরে মেলে ধরে বৃষ্টির আকাশ আর বৃষ্টির খেলা দেখতে লাগলো।হয়তো সে নীলিমার সাথে অজানা এক বাঁধনে বাঁধা পড়ে গেছে । 

মঙ্গলবার, ২৮ জুন, ২০১১

আকস্মিক স্তব্ধতা

"রনি ওই রনি,উঠছ না,ক্লাস শুরু হওয়ার সময় হয়ে গেছে,উঠ যলদি,কিরে উঠছ না কেন?আমি গেলাম ক্লাস করতে"- ১১ বছরের দেব তার বোর্ডিংস্কুলের রুমম্যাট রনিকে ডেকে নিরাশভাবে ক্লাসে চলে গেল।

রনি এখানে এসেছে প্রায় ছয় মাস।খুবই চঞ্চল প্রকৃতির ছেলে রনি।আর এই চঞ্চলতার কারনেই তাকে বোর্ডিংস্কুলে পাঠানো হয়েছে।বাসায় থাকাকালীন সময়ে বড় ভাইটাকে জ্বালিয়ে মারতো।সারাদিন মাথায় শুধু দুষ্টামির চিন্তা।একদিন করল কি,বড় ভাইটার স্কুলের প্যান্ট কেটে নিজের জন্য হাফপ্যান্ট বানিয়ে ফেলছিল। স্কুলে যাবার সময় হলে ভাই তার কান্ডকারখানা টের পায়।ওই দিন রনিকে তার ভাইটার কাছ থেকে অনেক মার খেতে হয়েছিল।তবে সে জানে যে যতই মারুক আর বকুক না কেন,তার ভাইটা তাকে অনেক ভালোবাসে।তাইতো প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় তার সব চেয়ে প্রিয় কিটকেট চকলেট নিয়ে আসতো তার জন্য।তার ক্রিকেট খেলা,সাইকেল চালানোর হাতেখড়িও হয় বড় ভাইটার কাছ থেকেই।

এখানে আসার পর তার মধ্যে তুমুল পরিবর্তন দেখা গেল।হঠাৎ করেই যেন ছেলেটা কেমন মনমরা হয়ে পড়লো।চোখের নিচে কালো দাগ পরে গেলো।কেমন যেন রোগা রোগা হয়ে গেলো।আর সব চেয়ে বড় পরিবর্তনটা হল,কখনো বড় ভাইটা তাকে দেখতে আসলে,তার সাথে আর দুষ্টামি করে না,বরং ভাইটাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে,একটা কথাও মুখ ফুটে বলে না।মনে মনে বিড়বিড় করে বলতে থাকে "ভাই,তোকে আমি অনেক ভালোবাসি রে" তার ভাইটাও কি একই কথা বলতো কিনা কে জানে!!!

আজ বৃহস্প্রতিবার।গ্রীষ্মের ছুটির আগে আজই শেষ ক্লাস।বোর্ডিংস্কুলের সকল ছাত্রের মধ্যে কত উত্তেজনা কাজ করতেছে,ক্লাস শেষে বাড়ি যাবে।কিন্ত এ কি!!! রনি তো দেখি এখনো ঘুমিয়ে আছে।ক্লাস শেষে দেব রোমে এসে বলতেছে"এই রনি উঠ না,আঙ্কেল-আন্টি এখনই চলে আসবে।উঠ বলতেছি।" কিন্ত রনির কোনো সারা-শব্দ নেই।

 দেবের কাছে রনিকে আগে অনেক রহস্যময় লাগত।রনি প্রায়ই রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতো আর কি যেন বিড়বিড় করে বলতো।দেব বোঝতো না,ঠাট্টা করে বলতো "কিরে রনি,তুই কি পাগল হয়ে গেছিস নাকি??"রনির কাছ থেকে কোনো উত্তর আসতো না।সে সব সময় কেমন যেন অন্যমনস্ক থাকতো।একদিন গভীর রাতে দেবের ঘুম ভেঙ্গে গেলে,অন্ধকার ঘরের মধ্যেই সে দেখতে পেল,রনি যেন কার ছবির দিকে তাকিয়ে কাঁদতেছে,দেবের কাছে আর অবোধ্য রইল না যে,ছবিটা তার বড় ভাইয়ের।রনির চোখের নিচের কালোদাগ গুলোর কারনও তার কাছে আর অস্পষ্ট রইলো না।

"রনি,আমার জাদুমণি উঠ না,উঠ সোনা,উঠ,দেখ তোর মা এসেছে তোকে নিয়ে যেতে।উঠ বাবা,বাসায় যে তোর ভাইটা তোকে এক সারপ্রাইস দিবে বলে অপেক্ষা করতেছে,উঠ না লক্ষী ছেলে আমার,উঠ।"মার কান্না জরানো কথাগুলো যে তার আদরের ছেলের কানে যাচ্ছে না।প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে বাইরে থেকে আম্বুলেঞ্চ এর শব্দ আসতেছে।